অপ্রিয় সত্য বলা রোগীর কথা
আমাদের বহির্বিভাগে প্রায়শঃই নিজেকে বড় মনে করা, বেশী কথা বলা, মাত্রাতিরিক্ত খোশ মেজাজী রোগীর দেখা মেলে।
আজও এমন এক ম্যনীক-(অসুস্থতাজনিত ভয়ানক রকমের উচ্চাকাঙ্ক্ষী) রোগী এলো’। ইতিপূর্বে সে কক্ষনোই আমাদের এখানে আসে নাই কিন্তু তার শারিরীক ভাষা ও বাচন ভঙ্গীতে মনে হচ্ছে এই হাসপাতালের-ই উর্ধতন কোন কর্মকর্তা বুঝি পরিদর্শনে ঢুকলেন। সাথের মানুষগুলো ইতস্ততভাবে ইতিউতি তাকাচ্ছে। টেবিলে একটি জাতীয় দৈনিক রয়েছে যার মোটা দাগের সংবাদ ছিল “রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গুলোর খেলাপী ঋন সোয়া লাখ কোটি টাকা”।
রোগীটি কোন রকম সৌজন্যতার তোয়াক্কা না করে পত্রিকাটি নিয়ে পড়তে লাগলো। আমরা রোগের তীব্রতা বুঝতে সাধারণতঃ এ ধরনের রোগী-কে প্রশ্ন করে থাকি, কি করেন, কি করতে পারেন, কি হতে ইচ্ছা করে, কি হতে চান? মজার ব্যাপার হলো এরা এদের কাছেপিঠে যা আছে তা নিয়েই কল্পনাপটু হয়ে ওঠে, তাই প্রশ্ন করা মাত্রই রোগী-টি নির্বিঘ্নে উত্তর দিলো –“আমি ঋনখেলাপী হবো। এমন মজার পেশা আর নাই, আমি হবোই।
কেন হতে চান, জিজ্ঞেস করতেই তার কথার তুড়ি ছুটতে লাগলো- ‘বড় বড় কোম্পানি খুলবো। ব্যবসা সফল ব্যক্তিত্ব হবো। দেশ বিদেশ ঘুরতে থাকবো। ক্রিকেট টিম বানাবো। আমার এলাকায় দাতব্য চিকিৎসালয়ে আপনাদের মতো দুই ডজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পুষবো। লোকের বাহাবা পাবো। নির্বাচন করে নেতা হবো। বেশী সমালোচনা হলে ঋন অবলোপন করাবো। বার্ধক্যকালে হজ্জ করে একটি বিশাল মসজিদ তৈরী করবো,,,
তার কথা থামছিল না। আমরাও অনেকাংশে কিছুক্ষনের জন্য হলেও ওর সাথে কল্পজগতে পাড়ি দিয়েছিলাম।
এ ধরনের ম্যনীক রোগীকে Infectious Manic Episode বলা হয়। আমার junior Colleague বললো – একে Injection দিতে হবে। অন্তঃবিভাগে ভর্তি করতে হবে। সে Ward Boy ডেকে ওকে তড়িঘড়ি করে ইঞ্জেকশন দিচ্ছে।
কিন্তু রোগী-টি তখনো চেঁচিয়ে যাচ্ছে আর বলছে — “আমাকে কেন ইঞ্জেকশান দিচ্ছেন। আমি কি ভূল বলেছি ? আমি অনেক বড় হতে চাই, অনেক অনেক বড়,,,, তাইতো ঋনখেলাপী হতে চাই। অন্যায় কি বললাম, আমি রোগী না, আপনারাই রোগী।”
এই প্রথম আমার সত্যি নিজেকে রোগী মনে হলো। মনে হলো চিকিৎসক, সেবিকা, ওয়ার্ড বয়কে বলি, ওকে Injection দিয়োনা। ও-তো সত্য বলেছে। পারলে ইঞ্জেকশানগুলো তাদের দাও, যারা কক্ষনো সত্য বলেনা। যারা পরের টাকায় পোদ্দারি করতে করতে পগার পার হয়ে যায়। কক্ষনো ধরা পড়েনা। ধরা পড়লেও জামাই আদরে থেকে দ্রুততম সময়ে জামিন নিয়ে নেয়, কিন্তু জামিনের শর্ত পালন করেনা। পুনরায় ভয়ানক রকমের উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে নতুন উদ্যোমে শুরু করে। কিন্তু মুখে থাকে জনদরদ, কক্ষনোই ঋনখেলাপি হওয়ার প্রকৃত কারণ মেনে নেয়না, মিথ্যাচারণ করে সব ঢেকে দেয়।
ডা. কবির জুয়েল : সাইকয়াট্রিস্ট কাম ড্রাগ অ্যাডিকশান স্পেশালিস্ট।