বেসরকারি মেডিকেল কলেজ : অসৎ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের টাকমেশিন
সামনে সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি বড় খরচ রয়েছে। মাসলম্যানরা তীর্থের কাকের মতো নির্বাচনমুখী হয়ে আছে। ক্ষুদে প্রার্থীদের কিনে ফেলা, বসতি ও নিম্ন আয়ের ভোট কেনা, কত্ত কাজ। সব-ই তো টাকার খেলা। আর নমিনেশন পাওয়া বাবদ পার্টিকে নগদ নজরানা তো দিতেই হবে। এখন থেকেই সব যোগান -এর ব্যবস্থাদি করতে হবে। মেডিকেল কলেজগুলো নব্যযুগের টাকমেশিনে পরিণত হয়েছে। তাইতো কওমি মাদ্রাসার চেয়ে এদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।অচিরেই সকল সাংসদের একটি করে মেডিকেল কলেজ থাকবে। শমরিতার গিনিপিগগুলো কেন যে আন্দোলন করছে — ওরা কি বুঝেনা উনি পুনরায় সাংসদ হয়ে ওদের নাম উজ্জল করবে। এখন তো সরাসরি চাঁদা নেয়া যায়না। ট্রিপল নাইন (৯৯৯) আছে না (যদিও ঘটনার সময় পু–লি–শ গুলো নিরবে দাঁড়িয়ে ছিলো) ,,, তাইতো চাঁদা-র এই নব-সংস্করণ।
আমরা এই ম—হা–হা—-ন সাংসদের সাথে সমস্বরে যে মানুষ-টিকে খুলি উড়াইয়া দেয়ার সায় দিতে দেখছি, তিনি আমার পুরোনো সিনিয়র কলিগ Prof. Dilip Kumar, তিনি সলিমূল্লাহ মেডিকেল কলেজের সাবেক Principal। এখন শমরিতার অধ্যক্ষ। আমি যতোটুকু জানি তিনি একজন সুচিকিৎসক ও গুনি শিক্ষক। কেন তিনি প্রকাশ্যে এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে এলেন ? আমাদের মাননীয় অধ্যাপকগণের কেউ কেউ সরকারী চাকুরী থেকে অবসরের পরে তল্পিবাহক ভেড়ুয়া শিক্ষকতা শুরু করে দিচ্ছেন। তারা মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের সুবিধাদি ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার বিষয়ে বেমালুম নিজের অসহায়ত্ব দেখিয়ে প্রকাশ্যে বেনিয়া মালিক পক্ষের পাল্লায় ঝুলে পড়ছেন। এই প্রবনতা মেডিকেল শিক্ষারত কচিকাঁচাদের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি মেডিকেল শিক্ষক হিসেবে আমাদের পক্ষে মেনে নেয়াও বিব্রতকর।
অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো আমাকে মাঝে মাঝে কিছু Private Medical College -এ Psychiatry Lecture নিতে হয়। ওরা যৎসামান্য -ই আমাদের দিয়ে থাকে। একদিন লেকচার গ্যালারি থেকে ক্লাস নিয়ে বেরিয়ে অনেক দূর এগিয়েছি, খেয়াল করলাম এক ছাত্র স-সংকোচে অনুসন্ধিৎসু নেত্রে পিছু পিছু আসছে। আমি দেশের বাইরে শিক্ষকতা করে এসেছি। তাই ক্লাশগুলোতে যথেষ্ট প্রাণবন্ত ও বন্ধুভাব বজায় রাখি, যা আমার ছাত্রদের সাহসী করে তুলে। এতে তারা নিঃশঙ্কোচে প্রশ্ন করতে পারে।
তাই মনে মনে ধরেই নিয়েছি, ছাত্রটি অথবা তার পরিবারের কেউ হয়তো মানসিক সমস্যায় ভূগছে, সে ব্যপারেই সমাধান চাইবে।
আমি ওর দিকে তাকালাম – কি হয়েছে, কিছু বলবে? ছেলেটি থতমত খেয়ে না-না বলে আমাকে গলিয়ে চলে যাচ্ছিলো, আমি বুঝলাম এখনো ওর সাহস কুলাচ্ছে না, অভয় দিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললাম, বলো কি বলতে চাচ্ছ, “সার ক্লাস প্রতি আপনারা এতো টাকা নেন কেন?”
আমি রীতিমতো অপ্রস্তুত হলাম, এ কেমন প্রশ্ন, কেন-ই বা সে আমাকে এ প্রশ্ন করছে? আমি তো গত বছরের ১৫-টি লেকচারশিপের টাকাই এখনো পাইনি, আদৌ পাবো কিনা জানিনা, পেলেও গাড়ীর তেল খরচ মিটিয়ে সামান্য-ই ওয়ালেটে ঢুকবে, অথচ এ নিয়ে ও এতো কৌতুহলী কেন? বললাম, ভাই আমি বিদেশ থেকে অনেক টাকার চাকুরি ছেড়ে চলে এসেছি শুধুমাত্র দেশে শিক্ষকতা করার জন্য। সলিমূল্লাহ মেডিকেল কলেজে ক্লাস নিয়ে থাকি, ছুটির পরে বা ছুটির দিনে তোমাদের ক্লাস নিতে আসি। এ আমার শখ বলতে পারো।
ছেলেটি অপলক অশ্রুধার চোখে বলতে থাকলো ; সার আপনাদের শখ মেটাতে যেয়ে আমার বোধ হয় আর ডাক্তার হওয়া হবেনা। সে আবার চলে যেতে উদ্যত হলো। আমি খুব-ই অবাক হলাম। ওর হাত জোর করে ধরে একটু দূরে নিয়ে গেলাম। অভয় দিয়ে পুরো ঘটনা শুনলাম। আমার আক্কেল গুড়ুম হবার উপক্রম হলো। ওরা জানে আমরা মাস শেষে লাখ টাকা নিয়ে যাই, একেক লেকচার ১০-২০ হাজার টাকা। আবার ওদের বেতন বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছে, গত বারই ওর পিতামাতা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। এবার ছেলেটি কি করবে? ও অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু তিন বছর আগের প্রশ্ন ফাঁসের কবলে পড়ে ঝড়ে পড়েছিল, মেডিকেলে পড়ার অদম্য ইচ্ছা থাকায় মধ্যবিত্ত মা বাবা এখানে ভর্তি করে দেয়। কিন্তু দফায় দফায় এভাবে যে ব্যবসায়ী পরিচালক বর্গীরা হানা দেবে- তা তাদের কল্পনার বাইরে ছিলো। এখন সে কি করবে? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে এই প্রশ্ন বারংবার সে আমাকে করছিলো।
আর আমি ছিলাম এক্কেবারেই নিরুক্তর।
ডা. কবির জুয়েল : সাইকয়াট্রিস্ট কাম ড্রাগ অ্যাডিকশান স্পেশালিস্ট।