Anorexia Nervosa –ধনীর দুলালীর খাদ্যগ্রহণজনিত বিলাসী শোক, গরীবের ঘোড়ারোগ।

—— ডঃ এম. এস. কবীর জুয়েল।

 

দরিদ্র শিশুটির প্রিয় খাবার আইসক্রিম, কিন্তু রোগটি হবার পর সে গতানুগতিক আইসক্রিমেও অনাগ্রহী হয়ে উঠেছিলো, তাই নগরীর সবচেয়ে নামী দামী আইসক্রিম সপে এনে ওকে ‘Flood Flooding’ করা হয়েছিলো, সবার ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য না হলেও কারো কারো জন্য এ ধরনের ‘ফুড ফ্লাডিং’ কার্যকরী, শিশুর মানসিক গঠন ও প্রকৃতি (Temperament) বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্তগুলো নেয়া যেতে পারে। একটি স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপের সহায়তায় কয়েক দিন ব্যাপি চেষ্টারত থেকে, এ যাত্রায় আমাদের ‘ফ্লাডিং টিম’ সফল হয়েছে,  পরবর্তীতে গরীব শিশুটি অন্যান্য খাবারের প্রতিও ক্রমান্বয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, তার ক্ষুধামন্দা ভাব কেটে গেছে।

তবে মনে রাখতে হবে ‘Flooding Venue’ must be an attractive & new one, শিশুটির জন্য তা অবশ্যই চিত্তাকর্ষক হতে হবে, তাহলেই অকস্মাৎ তার মাঝে খাদ্য গ্রহণের তাড়না বা প্রৈতি অনুভূত হবে। যদিও বা আমাদের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমনটি করার মতো পর্যাপ্ত সময় ও লোকবল থাকেনা, কিন্তু মাঝে মাঝে নিজস্ব উদ্যোগে অভিভাবকের সহায়তায় সল্প ঔষধের সাথে ইহা ফলদায়ক বটে।
… কারণ খুব অসহায় হতে হয়, যখন শিশু কিশোর মনোরোগে আক্রান্ত বাচ্চাগুলো নানারকম উপসর্গ নিয়ে আমাদের বহির্বিভাগ গুলোতে হাজির হয়, আর পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ থেরাপি প্রশিক্ষকের অভাবে উপয়ান্তর না থাকায় ওদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে বাধ্য হয়েই শুধু মানসিক রোগের ঔষধ লিখে যেতে হয়।
অথচ বিদেশে শিশুদেরকে কেবলমাত্র মনোরোগের ঔষধ কর্তৃক চিকিৎসাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অপারগতা হিসেবে গণ্য করা হয়, ২০১১-তে KFMC(King Fahad Medical City)- তে শিশু মনোরোগের প্রশিক্ষণের সময় ইহা আমাদের পঁই পঁই করে বোঝাচ্ছিলো নামকরা শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ, বিদেশে সকল সুবিধাসম্পন্ন(Well Equipped) চাকুরীকালীন সময়ে ইহার গুরুত্ব তেমন অনুধাবন করি নাই, পরবর্তীতে নিজ দেশে এসে বুঝতে পেরেছি।
প্রথমেই হাল্কা মাত্রার ঔষধের সাথে সাথে নানা রকম আচরণগত পরিবর্তন আনে এমন থেরাপির সূচনা করতে হবে, ক্ষুদ্র পরিসরে পারিবারিক বৈঠক করে বিষয়টি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের জানাতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে প্রয়োজন ভেদে ঔষধের মাএা বাড়ানো যেতে পারে।


ক্ষুধামন্দা ও অজীর্ণতা নিয়ে উপরোক্ত শিশুর আবির্ভাব হয়েছিলো আমাদের মনোরোগ বহির্বিভাগে; বেশ ক দিন ধরেই ইচ্ছে করে না খেয়ে থাকায় অপুষ্টির ছাপ তার চোখে মুখে বিরাজমান ছিলো, কারণ হিসেবে বরাবরের মতোই বের হলো, ‘মুটিয়ে যাবার অমূলক আশঙ্কা’, যা সাধারণত ধনীর বিলাসী কণ্যাদের উত্তরাধুনিক শারীরিক গঠনের নিমিত্তে মনোগত বৈকল্যের অন্যতম উপসর্গ বলে পরিচিত। প্রিন্সেস ডায়ানা, গ্রেটা গার্বো, ইসাবেলা সারো, ইলিয়ানা রামোস ইত্যাদি অনেক সেলিব্রেটি, অভিনেত্রী মডেলগণের মাঝে এ জাতীয় লক্ষণ ছিলো, এদের কেউ কেউ শেষমেশ এ রোগ নিয়েই ওপারে চলে যায়।

অস্বচ্ছল ও বুভূক্ষু সংসারে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গল্পটার কখনো শেষ হয়না, এ হেন ঘরেও কেউ একজন না খেয়ে দিনের পর দিন পার করে দিচ্ছে,বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক বটে, তবুও অশিক্ষিত অভিভাবক নিজ বুদ্ধি বিবেচনায় আমাদের শরণাপন্ন হয়েছিলো, আমরা তার যথার্থ প্রতিদান দিয়েছি। ‘Anrexia Nervosa’ কিংবা ‘Bulimia Nervosa’- কি? তা এই গরীব মানুষগুলো না বুঝলেও, নাড়ীছেঁড়া ধন অন্নবীনা দিন কে দিন পার করে দিচ্ছে, এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিলো না তাই আমাদের সহায়তা নিতে মানসিক বিভাবে চলে এসছে।


তবে এ সমাজে এখনো উল্টো চিত্র বিদ্যমান, কিছু ধনী ও সচ্ছল মানুষ প্রথাগত কারণে (Stigma Biased)কোনভাবেই তাদের শিশু-কিশোর-কিশোরীদের এই অনিয়ম গুলোকে মানসিক বৈকল্য ভাবতে নারাজ, তাদের এই নারাজি শেষ পর্যন্ত তাদের সোনামণিগণের জন্য ভয়ানক জটিলতা বয়ে আনে, সকল জটিলতার অবসান হোক; ওদের কল-কাকলীতে ভরপুর হয়ে যাক আমাদের ধনী-দরিদ্র প্রতিটি সংসার, শিশু মনোরোগে সচেতন উঠুক প্রতিটি পরিবার।

(জন সচেতনতার জন্য অভিভাবকের অনুমতিক্রমে ছবি সংযুক্ত হয়েছে)

Leave a Comment