পুলিশ ভাইদেরকে যুক্ত করে কোন মন্ত্রণালয়ের এতোটা ‘গায়েবী’ ভিত্তিহীন দুর্বল ‘চিঠি ইস্যু’ সচিবালয়ের ইতিহাসে ইতিপূর্বে কক্ষনো কি হয়েছে?
অধ্যাপক ডঃ এম. এস. কবীর জুয়েল।
###একটি_গায়েবী_মন্ত্রণালয়ের_কাহিনী_বলি, _শোনো……..
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিগুলো-র কি পাখা গজিয়েছিলো? ওরা কি নিজে নিজে গায়েব হয়ে যেতে পারে? কিংবা কেবল কম্পিউটার অপারেটর বা পিয়ন বা ক্লার্কদের পক্ষে কি এককভাবে ইহাদের লাপাত্তা করা আদৌ সম্ভব? ইতোমধ্যেই সি.আই.ডি কর্তৃক গ্রেফতারকৃত জোসেফ, আয়েশা, মিন্টু, বাদল, বারি ও ফয়সাল-ই কি ঘটনার মূল নায়ক-নায়িকা? অন্তত আমরা চিকিৎসকগণ মোটেই তা মনে করিনা, স্পষ্টতঃই বোঝা যাচ্ছে, দূর্নীতি আর অপকর্ম ঢাকতে সদা তৎপর এ গায়েবী মন্ত্রণালয়ের দূর্নীতিবাজ অর্থলিপ্সু কেরানীরুপী আমলাগুলো; কেন ইহাকে স্বাস্থ্যের বদলে গায়েবী মন্ত্রণালয় বলে আখ্যায়িত করছি, আসুন নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া ইনাদের গায়েবী কার্যাবলীর কিছুটা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি —
(১) ৩১ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত বসুন্ধরাস্থ অত্যাধুনিক করোনা হাসপাতালটি-কে প্রকাশ্য দিবালোকে এরা ‘গায়েব’ করে দেয়; পরে অধিদপ্তরকে দিয়ে লাখ টাকার বিজ্ঞাপন মারফত পত্রিকাগুলোতে সেই গায়েবী কর্মের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে, বৈশ্বীক মহামারী-র এ ক্রান্তিলগ্নে কতোটুকু অবিবেচক হলে এমন জননিন্দিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে? সরকারী চাকুরীজীবি হওয়া সত্ত্বেও আমি ও আমার মতো অনেকেই, যারা উত্তরা-কুরিল-বারিধারা-বসুন্ধরা-র বাসিন্দা তারা গত মার্চ-এপ্রিলে’২১ করোনার সেই ভয়াবহ সময়ে অত্যধিক ব্যয়বহুল হাসপাতাল “এভারকেয়ার” ও অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছিলাম, এদের গায়েবী ম্যাজিকের ক্ষেসারত হিসেবে কেবল আমার পকেট হতেই সাত লক্ষাধিক টাকা করোনা চিকিৎসায় চলে যায়।
(২) এরাই বাটপার রিজেন্ট শাহেদকে লাইসেন্স দিয়ে ৬০০০ ‘গায়েবী’ করোনা রিপোর্ট দেয়, তাদের এই গায়েবী রিপোর্ট নিয়ে বিদেশে যেয়ে বহু প্রবাসী তাদের চাকুরী হারায়, সে আপদকালীন সময়ে প্রবাসীদের জন্য নিবেদিত আমার নিজের Organisation, CAMMH(Centre for the Awareness of Migration Mental Health) এদের ভিসা-র মেয়াদ বৃদ্ধি সহ তাদের হতাশা কাটাতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে, কারন তখন অধিকাংশ দেশ বাংলাদেশের সাথে ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়, সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানো দেশ সৌদি আরবে আমি ১০ বছর আগে Consultant Psychiatrist রুপে সরকারী হাসপাতালে যোগদান করেছিলাম এবং আমি ‘সৌদী বোর্ড সার্টিফাইড’ হওয়ায় প্রবাসী ভাইদের জন্য আমার দেয়া Recommendations অনুযায়ী ওরা অনেকের ভিসা-র মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরে আমি শুধু কিছু মানুষকে সাহায্য করতে পেরেছিলাম, যারা হতাশাগ্রস্থ হয়ে আমার চেম্বারে এসেছিলো; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অধিকাংশের-ই ইকামা ও ভিসা-র মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, ফলে তারা চাকুরী হারায়; আমি বার বার চেষ্টা করেও সে সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের সমন্নয় ঘটাতে পারিনি, কারন সৃজনশীল ও দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত সচিব শ্রেণীর পরিবর্তে কেদারাগুলো দখল করে নিয়েছে অর্থগৃধু চাটুকার দুর্বৃত্তের দল, যে অভিবাসী শ্রমিকদের বৈদেশিক মূদ্রায় এ দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাদের সাথে প্রতারণা ও জালিয়াতির শাস্তি শুধু শাহেদ পাবে কেন, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিকে কেন জওয়াবদিহী করতে হলোনা? এদিকে ভূয়া এবং গায়েবী রিপোর্টের ছড়াছড়ি হওয়ায় পজেটিভ রোগীদের বিরাট অংশ না বুঝে সমাজে সকলের সাথে মিশে করোনার বিস্তৃতি ঘটায়, অথচ সেই শাহেদের বন্ধু তৎকালীন সচিব আসাদুজ্জামান সাহেব ঠিকই নিজের আখের গুছিয়ে গায়েবী জোরে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সচিব হয়ে যান। পক্ষান্তরে তৎকালীন ডিজি-কে এখনো দুদকে অপরাধী হয়ে হাজিরা দিতে হচ্ছিলো, পরবর্তীতে একজন অপরাধী-র ন্যায় আত্মসমর্পন করে তিনি জামিন নেন। দুদুকে হাজিরাকালীন সময়ে জেরাকারীর উত্তরে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, চুক্তির দিন-ই প্রথম তিনি শাহেদ-কে চেনেন, এর আগে কক্ষনোই তিনি শাহেদ নামক কাউকে চিনতেন না- বা তার বিষয়ে কিছু জানতেন না এবং মূলত মন্ত্রণালয়ের(গায়েবী) নির্দেশেই তিনি শাহেদ নামক বাটপারের জন্য রিজেন্ট হাসপাতালের কাগজ তৈরী করতে উদ্দোগী হন(সূত্র- Daily Star, প্রথম আলো ও অন্যান্য) অথচ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের আড়াল করে কেবল একজন মানি চিকিৎসককে দুদকে ফাঁসিয়ে দেয়া হলো। ব্যুরোক্র্যাট শাসিত এ দেশের অবস্থা এমন দড়িয়েছে যে, আজ যদি রবীন্দ্রনাথ বাঁচিয়া থাকিতো তাহলে ‘কেস্ট’ এর বদলে নতুন করিয়া লিখিত যাহা কিছু-ই ঘটুক, “সদা ডাক্তার ব্যাটা-ই চোর” হিসেবে গণ্য হইবে ; কাউকে কিছু করিতে না পারিলে চিকিৎসকদের দিকে অভিযোগের তীর নিক্ষেপে এ গায়েবী মন্ত্রণালয় খুব-ই সিদ্ধহস্ত। (৩)মন্ত্রণালয়ের গায়েবী কেটাকাটা-র খবর বাংলাদেশের স্কুল পড়ুয়া শিশুরাও এখন জানে, যেমন — ‘১ টি মাস্ক এর প্রকৃত মূল্য ৪৫ টাকা কিন্তু তা ৪৫০০ টাকায় কেনা হলে মাস্ক প্রতি কতো বেশী দেয়া হলো, এভাবে ৫০ হাজার মাস্ক কিনলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কতো গুন বেশী লাভ হলো?’ ১০-২০ গুন বেশী দামে মেডিকেল যন্ত্রপাতি কিনে সেখান থেকে নিজেদের অংশ বুঝে পেতে কোন কার্পণ্য করেনা এ কেরানীরুপি আমলাগুলান, সাথে যুক্ত করে নেন মিঠু-র ন্যায় আন্তর্জাতিক মানের চিটার ঠিকাদারদের, যারা মেডিকেল যন্ত্রাংশ ব্যতিরেকে খালি বাক্স দিয়েই দিনের পর দিন গায়েবী বিল বানিয়ে নেন, সে ছিলো আরেক গায়েবী আমল, যখন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা নিয়াজউদ্দিণ মিয়া থেকে শুরু করে চরম দূর্নীতিবাজ(পদোন্নতি ও নিয়োগ সংক্রান্ত) শহীদুল ইসলাম খান সাহেবরা দূর্নীতি-র মহিসোপান রচনা করেছিলেন, যাহার ধারাবাহিকতায় এ গায়েবী কান্ডসমূহ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
(৪) মান্নান সাহেবের আমলে হাসপাতাল উধাও হওয়া ছাড়াও আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, কিছু আইন শৃংখলা বাহিনীর অসৎ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে উপ, যুগ্ন ও অতিরিক্ত কেরানীগুলো বিভিন্ন পদোন্নতি বঞ্চিত বিভিন্ন চিকিৎসকদের নামে ‘গায়েবী’ অনুযোগের/অভিযোগের চিঠি পাঠিয়েছে এস.বি.(Special Branch) এর এডিশনাল আই.জি.পি কার্যালয়ে, যা নিয়ে পুলিশের সৎ কর্তাব্যক্তিরা নিজেরাই বিব্রত বোধ করছে; তবে কিছু সুযোগ সন্ধানী ইন্সপেক্টর এ সুযোগে দূর্বল চিত্তের চিকিৎসকদের ফোন করে পদায়ন ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিষয়ে সাহায্য করার কথা বলছে এবং নিশ্চয়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিনিময়ে মোটা অংকের লেনদেনের কথাটি পরোক্ষভাবে প্রকাশ করছে, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মহোদয় ভ্রক্ষেপ না করলে সরাসরি গায়েবী মন্ত্রণালয়ের কেরানীরুপী আমলাগুলোর বরাত দিয়ে পরিস্কার বুঝিয়েই দেয় যে, দিন কাল যা পড়েছে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ ব্যতিরেকে পদায়ন -পদোন্নতি অসম্ভব, আর এ পুলিশ রিপোর্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ ভাইদেরকে যুক্ত করে কোন মন্ত্রণালয়ের এতোটা ‘গায়েবী’ ভিত্তিহীন দুর্বল চিঠি ইস্যু সচিবালয়ের ইতিহাসে মনে হয় আর কক্ষনো হয়নি। অনেকেরই ধারনা ভূক্তভোগী চিকিৎসকগণ মানবাধীকার আইনজীবীর শরণাপন্ন হওয়ার হুমকি দেয়ায়, হয়তো ঐ সতেরো নথিতে এ সংক্রান্ত ফাইল -টি ও থাকতে পারে; যা তারা সরিয়ে ফেলেছে। একদা যে সেক্রেটারীয়েটে জনাব আসাফউদ্দৌলা, আলী ইমাম মজুমদার, আকবর আলী খান-দের মতো সৎ সাহসী আমলাদের দাপট ছিলো কালের বিবর্তনে তাহা গায়েবীখেলায় পারদর্শী খেলোয়াড়দের ক্রিড়াংগনে পরিণত হয়েছে, এবং সর্বাধিক খেলুড়ে নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যের দপ্তরেই বিদ্যমান, প্রথম আলোর রেজিনা কান্ডসহ অসংখ্য ঘটনায় ঘটনাবহুল করোনা-র প্রায় দু-দুটি বছর ইতোমধ্যেই তারা অতিক্রম করেছে, সেই সাথে তাদের ভাগ্যে জুটেছে সধারণ মানুষদের ভৎসনা আর গালাগাল; আশা করছি লক্ষ চিকিৎসকের এ মন্ত্রণালয় অবশ্যই অচিরে গায়েবীয়ানামূক্ত হবে এবং তাঁবেদারী না করে সাহসিকতার সাথেকৃত্ত পেশাজীবিদের একটা অংশ সেই আসনগুলো দখলে নেবেন, তাহলেই ১৯৯০ -এ প্রকৃচি-র ঐতিহাসিক আন্দোলন সফল হবে।



