জীবিতাবস্থায় অবজ্ঞা, মৃত্যুর পর বিনম্র শ্রদ্ধা; কি অদ্ভুত নিয়মের বেড়াজালে বন্দী এ রাষ্ট্র।

——  কবীর জুয়েল।

 

সত্যি-ই যে তুমি পালিয়ে ছিলেনা,লুকিয়ে ছিলেনা, তুমি আদৌ ভীতু ছিলেনা-তা প্রমাণ করতেই কি চিরতরে চলে গেলে?
সরকারী হাসপাতালে কোভিড রোগী দেখতে যেয়ে তুমি করোনাক্রান্ত হলে, কিন্তু ওখানকার আই.সি.ইউ থেকে দুটো বিছানা আইসোলেসন করে তোমার জন্য কোন সুব্যবস্থা ওখানকার প্রশাসন করলোনা, এ অভিমানে কি তুমি চলে গেলে?
তোমাকে পাঠানো হলো সিলেটের শামসুদ্দিন হাসপাতালের করোনা ইউনিটে, যেখানে তখনো সার্বক্ষনিক আই.সি.ইউ বিশেষজ্ঞ ছিলো না, হড়বড়ে ভেণ্টিলেটরের ওপর তোমার আস্থা হচ্ছিলোনা, তা-ই
তুমি নিজ থেকেই ঢাকায় আসতে চাইলে, তুমি কি জানো, তুমি আসার পর আজ ওরা ৯টি নতুন ভেন্টিলেটর লাগিয়েছে সেই কোভিড হাসপাতালে, মান্ধাতা পচা ভেন্টিলেটরের আধাভাঙ্গা সাপোর্টে তোমার ফুসফুসের ক্ষুদ্র রন্ধ্র (Alveoli)গুলো যখন অক্সিজেনের অভাবে সংকোচিত হচ্ছিলো, ওদের কিনা তখনই টনক নড়লো, কোভিড ওয়ার্ডের প্রধান নিয়ামক হলো ভেন্টিলেটর, তুমি কি ওদেরকে ভেন্টিলেটর-এর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতেই এভাবে চলে গেলে?
যারা কথায় কথায় বলে, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জন্য সবরকম সুবিধা রয়েছে, বাংলাদেশ ৩ মাস আগে থেকেই করোনা মোকাবেলায় প্রস্তুত, তুমি কি ওদের
প্রস্তুতির গোমড় ফাঁস করতেই চলে গেলে?
নিজের ফেসবুক ওয়ালে সব্বাইকে জানালে তোমার বাঁচবার আকুতি, তবুও ওরা বললো তোমার নাকি ঢাকা যাওয়ার দরকার নেই, এটা নিতান্তই পরিবারের সিদ্ধান্ত, আচ্ছা যে বা যারা প্রশাসনের পদে থেকে এ কথা বলেছিলো, সে আমলারুপি ডাক্তার নিজে অসুস্থ হলে কি শামসুদ্দিন হাস্পাতালের মতো সল্প সুবিধাসম্পন্ন করোনা ইউনিটে ভর্তি হতো? নিশ্চয়ই হৈ চৈ বাঁধিয়ে ফেলতো, এয়ার এ্যম্বুলেন্স আনিয়ে ছাড়তো, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রতি এ হেন বৈষম্যেমূলক আচরণকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখাতে-ই কি এ ধরা থেকে তুমি চলে গেলে?
তোমাকে Air ambulance তো দূরের কথা, একটি
Well Equipped এ্যম্বুলেন্স -ও তোমার কর্মক্ষেত্রের কর্তাবাবুরা ব্যবস্থা করে দিলোনা, তারা সাস্থ্য অধিদপ্তরকে বলেও তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেওয়াতে পারলোনা, সুদূর সিলেট হতে কয়েকশ মাইলের বন্ধুর পথ পেরিয়ে সহকর্মী চিকিৎসকদের চেষ্টায় একখানা গড়পড়তা এ্যম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পৌঁছলে, এ ক্ষমাহীন ক্লান্তি তোমায় আরো দূর্বল করে দিলো, তোমার ফুসফুসের কর্মদক্ষতা কমিয়ে দিলো, এ সময় প্রতিটি ক্ষণ মূল্যবান তা কি তোমার সিনিয়র অধ্যাপক সহকর্মীরা জানতো না, তুমি কি তাদের বোধোহয় জাগাতে-ই বিদায় নিলে?
তোমার পরিবার ও বন্ধুদের বিরাট অংশ বৃটেন নিবাসী,
তোমার সুযোগ থাকার পর ও, তুমি বিলেতে গেলেনা,
নিজ দেশে শুধু নয়, নিজ জেলায় যেয়ে মানুষকে সেবা
দিতে শুরু করলে; তুমি কি জানো, প্রবাস ফেরৎ রোগীদের কেউ কেউ তোমাকে সঠিক কথা বলেনি, সঠিক তথ্য দেয়নি, যা প্রতিনিয়তই এরা করে যাচ্ছে, তোমার আত্মত্যাগে হয়তো এখন ওদের অনুশোচনা হবে।
প্রবাস ফেরত যে রোগীদের থেকে তোমার মাঝে এ জীবানু সংক্রমিত হয়েছে, তাদের পুরো ২ সপ্তাহ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঙ্গরোধে থেকে সিলেট-সুনামগঞ্জ যাওয়ার কথা ছিলো, সারা বিশ্বের ভয়াবহতা দেখেও কেন সব জেনে শুনে বিমানবন্দর থেকে অভিবাসী শ্রমিকগুলোকে তারা নিজ নিজ জেলায় ছড়িয়ে দিলো? এ অব্যবস্থাপনার দায় আজ তোমায় নিতে হলো ।
তুমি কি সারা বিশ্ব থেকে এ হতভাগা জাতিকে শিক্ষা গ্রহণ করাতে-ই এভাবে অভিমান করে চলে গেলে?
আমাদের মতো অমেরুদণ্ডী সরিসৃপ প্রাণীগুলোকে ক্ষমা করে দিও, আমরা আজো নিজেদের সুরক্ষা ও আক্রান্তকালীন সুচিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠায়
একতাবদ্ধ হতে পারিনি, সারা দুনিয়ার ডাক্তারদের থেকেও আমরা কিছুই শিখতে পারিনি, কবে পারবো তা-ও জানিনা।
আমরা যে কেউ, যখন – তখন — তোমার পরিনতি ভোগ করতে পারি, পরে হয়তো– কিছু বিশেষণ লাগিয়ে ‘অমুক যোদ্ধা’-‘তমুক সৈনিক’ বলে আখ্যায়িত করা হবে।
জীবিতাবস্থায় অবজ্ঞা, মৃত্যুর পর বিনম্র শ্রদ্ধা ;
কি অদ্ভুত নিয়মের বেড়াজালে বন্দী এ রাষ্ট্র ;
তুমি কি এ নির্দয় প্রথা ভাঙ্গতেই
এ দেশের কোভিড নিরাময়ে প্রথম শহীদ
চিকিৎসক হিসেবে নিজের নামটি করোনাখাতায় লিখিয়ে গেলে ?

Leave a Comment