“দেশপ্রেমী ত্যাগী প্রবাসী চিকিৎসক-এর স্বপ্নভঙ্গ”- অভিবাসীদের মনঃকষ্ট বাড়বে।

অধ্যাপক ডাঃ এম. এস. কবীর জুয়েল।

ডাক্তার ভাইটির জন্য খুব খারাপ লাগছে, সৌদিতে অনেক ভালো পরিবেশে চাকুরীরত ছিলো, অনেক টাকার বেতন সত্ত্বেও নিজ দেশের মানুষগুলোকে সেবা দিতে দেশে ফিরে এসেছিলো, আমরা তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলাম, তার স্বপ্নগুলোকে সে পুরোপুরি বাস্তবে পরিণত করতে পারলো না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে আমিও সৌদিতে গিয়েছিলাম ২০০৯ এর মাঝামাঝি সময়ে, আমার সহকারী চিকিৎসক রুপে ছিলো মিশরীয়, সুদানী, সিরিয়ান ও জর্ডানী চিকিৎসকগণ, তারা আমাকে বেশ সহায়তা করতো কিন্তু নিজ দেশের মানুষগুলোকে কোন সাহায্য করতে চাইলে কৌশলে এড়িয়ে যেতো, ফলে ইচ্ছা থাকা সত্তেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের খুব বেশী সাহায্য করা যেতোনা, ঔষধ ও অন্যান্য সকল সুবিধাদি ছিলো কেবলমাত্র নির্দিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য বরাদ্দ, আমি এ বিষয়টি শুরুর দিকে জানতাম-ই না, তাই নিজ দেশের কেউ এলে অনায়াসে তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করতাম, আমাদের ফার্মাসিষ্ট ছিলো একটি ফিলিস্তিনি ভদ্রমহিলা, ঔষধের স্লিপ লিখে দিলে উনিও কৌশলে আমার স্লিপ ফিরিয়ে না দিয়ে কিছু ঔষধ দিয়ে ওদের বিদায় করতো, কিন্তু এভাবে কিছুদিন চলার পর, আমি হঠাৎ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহীর নিকট প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম উনি ভরা মিটিং এ বলেই বসলেন — Dr.Kabir ! You are not entitled to serve other than allocated people. Our Kingdom recruited you with lucrative salary to serve us only, except some particular ground or any emergency situation if raises.

আমি প্রথমে কিছুটা বাধ সাধলেও পরবর্তীতে তাদের লিখিত নীতিমালা দেখে বুঝলাম, আসলে আমি এখানে অসহায়, প্রবাসী বাংলাদেশীদের(Migrant Workers of Bangladesh) পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধা দেবার অধিকার এরা আমাকে দেয়নি, চাকুরীতে প্রবেশের প্রাক্কালে তারা যে কাগজ পত্রে স্বাক্ষর নিয়েছিলো সেখানে আরবিতে অনেক কিছুই লেখা ছিলো, তমধ্যে ইহাও একটি। এখানে সব চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা ছিলো, ডা.শাহ আলম ভাইয়ের জন্যে ব্যতিক্রম হবার সুযোগ নেই, যাহোক এসব অতৃপ্তি নিয়েই আমরা যথারীতি আমাদের কর্তব্য পালন করে যেতাম।
আমার অন্যতম সহকারী চিকিৎসক ছিলো সিরিয়ান ডা.ফুয়াদ, ও আমার মনো:কষ্ট বুঝতে পারতো, সে ছিলো রাকঢাকহীন সরল স্বভাবের মানুষ, তার বুদ্ধিতে আমি অন্য পথ বের করলাম, একটি বাকালা বা মুদি/স্টেশনারী দোকানে যেয়ে ছুটির দিনে ওদের সহায়তা করতাম, ওখানে সরকারী চাকুরীরত অবস্থায় ফার্মেসীতে বসে অফিসিয়ালি অন্যত্র রোগী দেখার নিয়ম ছিলোনা, আর ফার্মেসীগুলো মন্ত্রণালয় আদিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ব্যতীত অন্য কারো ব্যবস্থাপত্র গ্রহন করেনা, সুতরাং আমাদের দেশের যে সাধারণ মানুষগুলো নিজ উপসর্গ বলে বলে ফার্মেসী না ডিসপেনসারি থেকে ঔষধ সেবনে অভ্যস্ত মধ্যপ্রাচ্যের যে কোন দেশে যেয়ে প্রথমাবস্থায় তারা স্বাস্থ্য সুবিধা ও ঔষধ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বেশ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে থাকে। আমি আমার ও ফুয়াদের নামে সদাই কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় ঔষধ তুলে নিতাম, যা দিয়ে সপ্তাহান্তে তাদের প্রয়োজন অনেকটা মেটানো যেতো, আর শুক্র ও শনী দুদিন ছুটি থাকায় আমি নির্বিঘ্নে এই সুযোগটা কাজে লাগাতাম। আমি একটি সরকারী বিশেষায়িত হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ছিলাম, সৌদি ও অন্যান্য আরব দেশের নাগরিকরা এসে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও পূর্ণ সময়কালের সকল প্রকার ঔষধ নিয়ে যেতো, আমার এলাকায় কয়েক হাজার বাংলাদেশী ভাই বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলো, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আপদে তারা সকলেই আমাদের হাসপাতালে আসতে পারতো না, ইচ্ছে থাকলেও আমি তাদের সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সাহায্য করতে পারতাম না, এ অনুশোচনা আমাকে বড্ড কষ্ট দিতো, মাঝে মাঝে মনে হতো কতোটা অকৃতজ্ঞ আমি, যারা তাদের ঘাম ঝরানো টাকার অংশে আমাকে সরকারী মেডিকেল কলেজে পড়ানোর সু্যোগ করে দিয়েছিলো, আজ তাদের সেবা না দিয়ে পেট্রো ডলার কামাতে বিদেশে পাড়ি দিয়েছি, আর এখানে এসেও ওদের(NRB-Non Resident Bangladeshi) তেমন কোন উপকার করতে পারছিনা। মনে মনে ডা.শাহ আলম ভাইয়ের মতো আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সুযোগ পেলেই দেশে ফিরে এ ঋণ শোধ করার চেষ্টা করবো। বিদেশে যেয়ে দিনকে দিন অন্য দেশের নাগরিকদের সেবা দিলে চিত্ত মাঝে এক অতৃপ্তি বাসা বাধেঁ, সেই অতৃপ্তি অবসানেই ডা.শাহ আলম ভাই এই শুভ উদ্দোগটি গ্রহন করেছিলো বলে আমার বিশ্বাস;
মধ্যপ্রাচ্যে চাকুরীর সমুদয় আয় নিয়ে তিনি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় পাড়ি জমাতে পারতেন কিংবা মালয়েশিয়ায় Second Home করতে পারতেন। দেশাত্মবোধের তাড়নায় অন্যদের পরামর্শ উপেক্ষা করে, দেশের দরিদ্র মানুষগুলোর সেবা করার জন্যই তিনি নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন।


ডাঃশাহ আলমের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের প্রবাসী চিকিৎসকদের মাঝে দেশবিমুখতা তৈরী করতে পারে। প্রত্যাশা করি অত্র এলাকার সামর্থবান ব্যক্তিদের সহায়তায় তার এই অসম্পন্ন উদ্যোগটি পুরোপুরি বিকশিত হবে এবং আমাদের পেশাজীবি সংগঠন ও তার এ স্মৃতি রক্ষার্থে ভালো ভূমিকা রাখবে। আল্লাহ তাকে ও তার এই মহান কর্মকে কবুল করুন।

Leave a Comment